Sheikh Fazlul Haque Mani

১৯৩৯-১৯৭৫

সুলেখক, মেধাবী সাংবাদি, সংগ্রামী জননেতা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক পরিচয়কেই ধারন করে মাত্র ৩৫ বছর জীবনের ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন শেখ ফজলুল হক মণি। গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে এক সভ্রান্ত শিক্ষিত মুসলিম পরিবারের ১৯৩৯ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন শেখ ফজলুল হক মণি। পিতা শেখ নুরুল হক ছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত ইসলাম সাধক ও প্রচারক হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রাঃ) সহচর দরবেশ শেখ আউয়াল এর বংশধর তদানীন্তন ফরিদপুর মহাকুমার জমিদার কুদরতউল্লাহ শেখ (কদু শেখ) এর পৌত্র। শেখ নুরুল হক উচ্চ শিক্ষা সম্পন্ন করে বৃটিশ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। শেখ মণির মাতা আছিয়া বেগম ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান-এর বড় বোন। 
শেখ ফজলুল হক মণি ঢাকার নবকুমার ইনস্টিটিউট থেকে ১৯৫৬ সালে ম্যাট্রিক, ১৯৫৮ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে আই,এ, ১৯৬০ সালে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে বি.এ এবং ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এম.এ. এবং পরবর্তীকালে কারা বন্দী অবস্থায় আইন শাস্ত্রে এল.এল.বি ডিগ্রী লাভ করেন। 
ছাত্রাবস্থা থেকেই তিনি রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। ১৯৬২র শরীফ শিক্ষা কমিশন, ১৯৬৪র হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলনের তিনি ছিলেন সম্মুখ সারির নেতা। তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের ১৯৬২-৬৩ মেয়াদ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং দীর্ঘদিন ছাত্র সমাজকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। আজকে যে ছাত্র রাজনীতির অতীত ঐতিহ্যের কথা গৌরবের সাথে বলা হয় তিনি ছিলেন তার অন্যতম প্রধান নির্মাতা। কর্মীদের নেতা ছিলেন তিনি। কিন্তু তার চেয়েও বেশী ছিলেন কর্মী গড়ার কারিগর। ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠান বর্জন করার আন্দোলনে তেজস্বী ভূমিকার জন্য মোনায়েম সরকার তাঁর এম.এ.ডিগ্রী কেড়ে নিয়েছিলেন। পকৃতপক্ষে পুরো ষাটের দশক জুড়েই বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তিনি ব্যাপৃত ছিলেন বাঙ্গালীর স্বাধীকার আন্দোলনের জন্য উপযুক্ত কর্মী ও সংগঠন করার কাজে। ১৯৬৬র ৬দফা আন্দোলন, ৬৯র গণঅভ্যূত্থান সংঘঠনে শেখ মণি কেবল নেতা নন, আন্দোলনের থিংক ট্যাংক হিসেবেও কাজ করেছেন। বঙ্গবন্ধু ঘোষিত বাঙ্গালির মুক্তিসনদ ৬দফা আন্দোলনে গ্রেপ্তার হয়ে প্রায় তিন বছর কারাগারে ছিলেন তিনি। পরবর্তীকালে ৭১ সালে এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠা নেতা কর্মীদেরই সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধায় পরিণত করার মাধ্যমে সম্মুখ সময়ে তার নেতৃত্বের সফলতার প্রমাণ দেন। সতীর্থ সিরাজুল আলম খান এবং অনুজপ্রতিম আব্দুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদকে সাথে নিয়ে তিনি গড়ে তোলেন বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ) যা ‘মুজিব বাহিনী’ নামে ইতিহাসে স্বমহিমায় উজ্জল। শ্রমিক রাজনীতির নেতৃত্বেও ছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে শেখ ফজলুল হক মণি ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের প্রথম যুব সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এদেশে যুব রাজনীতির সূচনা করেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। 
মেধাবী ছাত্র নেতা শেখ ফজলুল হক মণি রাজনীতির ব্যস্ততার মধ্যেও পড়ালেখা করতেন ব্যাপক। তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহশালার বইপত্র যে কাউকে বিস্মিত করবে। ১৯৭০ সালের আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক নির্বাচনী ইশতেহারের তিনি ছিলেন অন্যতম প্রণেতা। ১৯৭০ সালেই তিনি প্রকাশ করেছিলেন সাপ্তাহিক বাংলার বাণী, যা স্বাধীনতার পর দৈনিক বাংলার বাণীতে রূপান্তরিত হয়। ১৯৭৩ সালে প্রকাশ করেন বিনোদন ম্যাগাজিন ‘সাপ্তাহিক সিনেমা’। ১৯৭৪ সালে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ইংরেজি ‘দৈনিক বাংলাদেশ টাইম্স’। লেখালেখিও করতেন তিনি সপ্রতিভাভাবে। বাংলার বাণী ও টাইমসের জন্য ইংরেজী বাংলা দুই ভাষাতেই সম্পাদকীয় লিখতেন তিনি। আরও আগে ১৯৬৯সাল ‘বৃত্ত’, নামে লিখেছিলেন গল্প সংকলন। পরে এটি ‘গীতারায়’ নামে দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। ‘বাংলাদেশে গণহত্যা’ সম্ভবত তাঁর সবচেয়ে উজ্জল ও ঐতিহাসিক সম্পাদনা। তাঁর রচিত উপন্যাস অবলম্বনে ‘অবাঞ্চিতা’ নামে একটি জনপ্রিয় টেলিফিল্ম তৈরী হয়েছে। 
দুই শিশু পুত্র শেখ ফজলে শামস্ পরশ ও শেখ ফজলে নূর তাপসকে অসহায় অবস্থায় রেখে অদম্য সাহসী জননেতা শেখ ফজলুল হক মণি যখন সহর্ধমিনী বেগম আরজু মণিকে সাথে নিয়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট ঘাতকের বুলেটে মৃত্যুকে আলিংগন করেন তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৩৫বছর।